কাবা ঘরের তাওয়াফ কেন করা হয়? ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা
ভূমিকা
কাবা শরিফ মুসলমানদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র স্থান। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মুসলিম নামাজের সময় কাবার দিকে মুখ করে ইবাদত করেন। আর হজ এবং ওমরার সময় মুসলমানরা এই পবিত্র ঘরটির চারপাশে তাওয়াফ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন মুসলমানরা কাবা ঘরের তাওয়াফ করে?
এই প্রবন্ধে কাবা শরিফের তাওয়াফের ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
তাওয়াফ কী?
ইসলামী পরিভাষায়, তাওয়াফ বলতে কাবা শরিফের চারপাশে সাতবার ঘোরা বোঝায়। এটি হজ ও ওমরার একটি বাধ্যতামূলক ইবাদত।
তাওয়াফ করার সময় মুসলমানরা সাধারণত "লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক..." বলে দোয়া পড়ে, যা আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের প্রতীক।
কেন মুসলমানরা কাবার তাওয়াফ করে?
১. আল্লাহর নির্দেশ পালন
তাওয়াফ করা একান্তভাবে আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য। কুরআনে বলা হয়েছে:
"আমি ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-কে আদেশ করেছিলাম: আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।" (সূরা আল-বাকারা: ১২৫)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, তাওয়াফ শুধু ইসলামের প্রচলিত নিয়ম নয়, বরং এটি আল্লাহর সরাসরি আদেশ।
২. নবী ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর স্মৃতি
কাবা শরিফের ইতিহাস বহু পুরনো। এটি প্রথম নির্মাণ করেন নবী আদম (আ.)। পরবর্তীতে নবী ইব্রাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.) আল্লাহর নির্দেশে কাবাকে পুনর্নির্মাণ করেন এবং মানুষকে এখানে এসে তাওয়াফ করতে বলেন।
তাদের স্মৃতিকে ধারণ করতেই মুসলমানরা তাওয়াফ করে।
৩. ফেরেশতাদের অনুসরণ
হাদিসে এসেছে, আল-বাইতুল মা'মুর (ফেরেশতাদের জন্য স্বর্গে থাকা একটি পবিত্র ঘর) আল্লাহর আরশের চারপাশে রয়েছে, যেখানে ফেরেশতারা প্রতিদিন তাওয়াফ করেন।
মুসলমানরা যখন কাবা শরিফের চারপাশে তাওয়াফ করে, তখন তারা ফেরেশতাদের অনুসরণ করছে বলে মনে করা হয়।
৪. আত্মসমর্পণের প্রতীক
তাওয়াফ হলো আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের বহিঃপ্রকাশ। যখন একজন মুসলমান কাবার চারপাশে ঘোরে, তখন সে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে শুধুমাত্র আল্লাহর দিকে ফিরে যায়।
তাওয়াফের মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, মানুষের জীবন আল্লাহকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।
৫. মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক
তাওয়াফ করার সময় ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, কালো-সাদা সব মানুষ একই কাতারে এসে দাঁড়ায়। এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই।
তাওয়াফ প্রমাণ করে যে, ইসলামে জাতি, বর্ণ ও সামাজিক অবস্থানের কোনো গুরুত্ব নেই—সবার অবস্থান আল্লাহর সামনে সমান।
৬. আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি ও আত্মশুদ্ধি
তাওয়াফের সময় মুসলমানরা কেবল শারীরিকভাবে হাঁটেন না, বরং তাদের মন, আত্মা ও চিন্তাভাবনাও আল্লাহর প্রতি নিবেদিত হয়।
তাওয়াফ করার ফজিলত:
-
এটি গুনাহ মাফের একটি মাধ্যম
-
আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়
-
হৃদয়ে ঈমানের শক্তি বৃদ্ধি পায়
-
মানসিক শান্তি পাওয়া যায়
তাওয়াফের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিস
তাওয়াফের গুরুত্ব বোঝাতে নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাবার তাওয়াফ করল, তার প্রতিটি কদমে একটি গুনাহ মাফ করা হয় এবং একটি নেকি লেখা হয়।" (তিরমিজি: ৯৬০)
এছাড়া, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তাওয়াফ হলো নামাজের মতো, কিন্তু এতে কথা বলা জায়েজ, তবে ভালো কথা বলবে।" (সহিহ মুসলিম: ১২৭৪)
তাওয়াফের নিয়ম (সংক্ষেপে)
১. ইহরাম বাঁধা: হজ বা ওমরার জন্য ইহরাম পরিধান করতে হয়।
2. তাওয়াফ শুরু করা: হাজরে আসওয়াদের (কালো পাথর) সামনে এসে নিয়ত করা।
3. সাতবার কাবার চারপাশে ঘোরা: প্রতিবার হাজরে আসওয়াদের সামনে এলে তাকবির বলা।
4. তাওয়াফের দোয়া: বিভিন্ন দোয়া পড়া যায়, তবে বিশেষ কোনো বাধ্যতামূলক দোয়া নেই।
5. মাকামে ইব্রাহিমে নামাজ পড়া: দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা।
6. জমজমের পানি পান করা: এটি সুন্নত।
উপসংহার
কাবা শরিফের তাওয়াফ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি শুধুমাত্র হজ ও ওমরার একটি অংশই নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি মুসলমানদের আত্মসমর্পণ, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং আত্মশুদ্ধির প্রতীক।
তাওয়াফ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে আল্লাহ, দুনিয়ার বস্তু নয়। এই ইবাদতের মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহর কাছে আরও বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পায়।
তাই, যখনই কেউ মক্কায় যান, তিনি যেন এই পবিত্র ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে।
-
কাবা ঘরের তাওয়াফ
-
কেন তাওয়াফ করা হয়
-
তাওয়াফ করার ফজিলত
-
হজ ও ওমরার তাওয়াফ
-
ইসলামে কাবার গুরুত্ব
-
কাবা শরিফের ইতিহাস